সংখ্যালঘু অধিকারে, নতুন প্ল্যাটফর্ম, বিশাল জমায়েত

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংখ্যালঘু অধিকারে ১৩ প্ল্যাটফর্ম, বড় জমায়েত হয়েছে।
সংখ্যালঘু অধিকারে, নতুন প্ল্যাটফর্ম, বিশাল জমায়েত

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ১৩টি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়। গত পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম, রংপুর ও ঢাকায় বড় জমায়েত করা হয়েছে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায়। এই আন্দোলনের পেছনে কারা আছে, তা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা জানবেন এদের পেছনে বাংলাদেশী নিপীড়িত সনাতন ধর্মবালম্বীরাই আছেন।

ঢাকা, ০৬ জানুয়ারি, ২০২৫: গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন পর্যন্ত ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ১৩টি নতুন প্ল্যাটফর্ম (মোর্চা বা জোট) তৈরি হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে গত পাঁচ মাসে একক বা যৌথভাবে বিশাল জমায়েত করা হয়েছে চট্টগ্রাম, রংপুর ও ঢাকায়। এই ঘটনাগুলো দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দাবিতে হঠাৎ করে এত প্ল্যাটফর্ম তৈরি হওয়ার পেছনে কারা আছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে।

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা বিভিন্ন পুরোনো সংগঠনের নেতারা বলছেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আছে। কিন্তু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবারের মতো এত বড় আন্দোলন আর হয়নি। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলার প্রতিবাদে এবার যে মাত্রায় আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে, তা বিগত কয়েক দশকে দেখা যায়নি।

নতুন যেসব প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট। এই জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। তাঁর ডাকে গত অক্টোবর ও নভেম্বরে চট্টগ্রামে এবং রংপুরে বিশাল দুটি সমাবেশ হয়, যা দেশের বাইরেও আলোচনার জন্ম দেয়। চিন্ময় কৃষ্ণ একসময় ইসকন (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ) বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাঁকে গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হলে পুলিশের সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের সংঘর্ষ হয়।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট ছাড়াও সংখ্যালঘুদের আরেকটি নতুন প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই দুটি প্ল্যাটফর্মের জন্ম হয়। কাছাকাছি সময়ে আত্মপ্রকাশ করা অন্য প্ল্যাটফর্মগুলো হলো বাংলাদেশ সচেতন সনাতনী নাগরিক, বাংলাদেশ সনাতনী সচেতন ছাত্রসমাজ, সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলন, সনাতনী অধিকার আন্দোলন, বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট, সনাতন অধিকার মঞ্চ, সনাতনী ছাত্রসমাজ, বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র-জনতা, বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমাজ সুরক্ষা কমিটি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্ল্যাটফর্মের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, নেতৃত্বে রয়েছেন মূলত সাধু-সন্ন্যাসী (মন্দির-মঠের পুরোহিত) ও শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় ঠিক কতটি সংগঠন কাজ করছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য কারও কাছে নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বিভিন্ন নামে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ে ৫০টির বেশি সংগঠন সক্রিয়। নতুন যে ১৩টি প্ল্যাটফর্ম ও সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, তার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়কেন্দ্রিক সংগঠনই ১১টি।

নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে আট দফা দাবি তোলা হয়েছে। প্রথম দফা হলো ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে দোষীদের দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনসহ অন্যান্য দাবিও রয়েছে।

এসব দাবির বিষয়ে গত ১৩ আগস্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙগে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধান উপদেষ্টা।

তবে নতুন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ইতিবাচকভাবেই দেখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও। তিনি বলেন, যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর দুঃখ-বেদনা তুলে ধরার অধিকার আছে। এ ধরনের সমস্যা তুলে না ধরা গেলে সেটা আরও জটিল আকার ধারণ করে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষে এই আন্দোলনগুলো স্বতঃস্ফূর্ত এবং নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন বোধ করে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছেন।

তারিখ: ০৭.০১.২০২৫