চট্টগ্রামে হিন্দু যুবককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল মৌলবাদীরা

চট্টগ্রামে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে হিন্দু যুবক প্রান্ত তালুকদারকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর পক্ষে ফেসবুকে পোস্ট করায় এই হামলা হয় বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ প্রান্তকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ঘটনায় এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি।
চট্টগ্রামে হিন্দু যুবককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল মৌলবাদীরা

চট্টগ্রামে প্রান্ত তালুকদার নামে এক হিন্দু যুবককে ফেসবুকে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর সমর্থনে পোস্ট করার অভিযোগে অপহরণ ও মারধর করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে প্রান্তকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে। পুলিশ লালখান বাজার এলাকা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে। প্রান্ত বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যদিও ঘটনায় এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর জামিন শুনানি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম, ০২ জানুয়ারি, ২০২৫: চট্টগ্রামে এক হিন্দু যুবককে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে। জানা গেছে, চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর সমর্থনে ফেসবুকে পোস্ট করার কারণে প্রান্ত তালুকদার নামের যুবককে মৌলবাদীরা অপহরণ করে ও মারধর করে। ঘটনাটি ঘটে বুধবার রাতে, যখন প্রান্ত তালুকদার পতেঙ্গা কাঠগড় এলাকায় নিজের বাড়িতে ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রান্তের অপহরণের দৃশ্য পাড়ার একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে, যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাত ১১টার দিকে খুলশি থানার লালখান বাজার এলাকা থেকে প্রান্ত তালুকদারকে উদ্ধার করা হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ লালখান বাজারের আমিন সেন্টারের পার্কিংয়ে গিয়ে দেখে, সেখানে কিছু লোক প্রান্তকে ঘিরে রেখেছে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। মারধরের ফলে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রান্তকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এই ঘটনার পেছনে কারণ হিসেবে জানা গিয়েছে, প্রান্ত তালুকদার ফেসবুকে ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর পক্ষে একটি পোস্ট করেছিলেন। গত ২৫ নভেম্বর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরপর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।

প্রান্তের পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যাবেলায় অচেনা কিছু ব্যক্তি তাঁদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। পরিবারের সামনেই প্রান্তকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান।

খুলশি থানার ওসি মুজিবুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে এই ঘটনা ঘটেছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর গ্রেপ্তারের পর থেকেই চট্টগ্রাম এবং আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর শুনানির সময় আদালত চত্বরে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হন। তখন পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একজন আইনজীবী সাইফুল ইসলাম নিহত হন। তাঁর হত্যার ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যে চন্দন দাস নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে।

চন্দন দাসকে গ্রেফতারের পর পুলিশ জানায়, সাইফুল ইসলামের হত্যাকাণ্ডে আরও ১৫ থেকে ২০ জন ব্যক্তি জড়িত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের মতে, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং দ্রুতই তাদের গ্রেফতার করা হবে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম আদালতে আজ চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর জামিন শুনানির কথা রয়েছে। প্রান্ত তালুকদারের ওপর হামলার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা দাবি করেছেন, এই ধরনের হামলা সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করছে।

প্রান্ত তালুকদারের ওপর হামলা এবং চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুর গ্রেপ্তার বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি সম্প্রতি ঢাকা সফর করেন এবং বিষয়টি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ে উত্থাপন করেন।

তবে এখনও পর্যন্ত প্রান্ত তালুকদারের ওপর হামলার ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রান্ত তালুকদার একজন শিক্ষিত যুবক এবং তাঁর বিরুদ্ধে আগে কোনো অভিযোগ ছিল না। তাঁরা দাবি করেছেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিপন্থী।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এবং নাগরিক সমাজ এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, প্রান্ত তালুকদারের উপর হামলার ঘটনায় তারা কোনও ধরনের গাফিলতি করবে না এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।

তারিখ: ০২.০১.২০২৫