ঢাকা মানছে না দিল্লির সংখ্যালঘু নির্যাতন-তথ্য
Categories:

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যান নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংহ দাবি করেছেন, ২০২৩ সালে নভেম্বর পর্যন্ত ২২০০টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ সরকারের দাবি, এই সংখ্যা বিভ্রান্তিকর এবং প্রকৃত সংখ্যা ১৩৮টি। একই সময় নাটোর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। নাটোরে সেবায়েত তরুণকুমার দাসকে হত্যা ও লুটপাট করা হয়। অন্যান্য হামলায় ধর্মস্থানে ভাঙচুর চালানো হয়।
ঢাকা, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যা নিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংহ সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, ২০২৩ সালে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ২২০০টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
এই পরিসংখ্যান নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। ইউনূস সরকারের প্রেসসচিব শফিকুল আলম শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, “ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের যে সংখ্যা প্রচার করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। এর সঙ্গে সত্যের মিল নেই।”
শফিকুল আলম দাবি করেছেন, সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৩৮টি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। আরও বলা হয়েছে, এই ১৩৮টি ঘটনার মধ্যে ৯৭টি ঘটেছে অগস্টের ৪ থেকে ৮ তারিখের মধ্যে, যখন ইউনূস সরকার ক্ষমতায় ছিল না।
এদিকে, গত ৪৮ ঘণ্টায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের চারটি উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহ, দিনাজপুর এবং নাটোরে এসব হামলা হয়।
নাটোরে শুক্রবার রাতে ধর্মস্থানে হামলা চালায় দুষ্কৃতীরা। উপাসনালয়ের গ্রিল ভেঙে ঢুকে সেবায়েত তরুণকুমার দাস (৫৫)-কে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে এবং লুটপাট চালায়। কয়েক লক্ষ টাকার সামগ্রী এবং অর্থ লুট করে তারা। যাওয়ার সময় সেবায়েতকে হত্যা করা হয়।
শনিবার সকালে স্থানীয়রা উপাসনালয়ে গিয়ে ভোগের ঘর থেকে তাঁর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু হয়েছে, তবে এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় শুক্রবার রাতে একদল মৌলবাদী সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে হামলা চালায়। তারা ইসকন-বিরোধী স্লোগান দেয় এবং উপাসনালয়ে ভাঙচুর চালায়। আতঙ্কিত সংখ্যালঘুরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।
এছাড়া বৃহস্পতি ও শুক্রবার ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটায় মৌলবাদীরা একটি ধর্মস্থানে হামলা চালায়।
বিলজোরা এলাকার পলাশকান্দায়ও একটি ধর্মস্থানে হামলা করে দুষ্কৃতীরা। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে একজনকে গ্রেফতার করেছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমান। মৌলভীবাজারে এক কর্মীসভায় তিনি বলেন, “আপনারা নিজেদের চেহারা এক বার আয়নায় দেখুন— ভারতের সংখ্যালঘুদের প্রতি কী আচরণ করা হয়, সেটাও দেখা উচিত।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারত বরাবর বাংলাদেশের সমাজকে বিভক্ত করে এসেছে। শফিকুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি-বিপক্ষের শক্তি, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু— ভারত নানা ভাবে বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে। তাদের উদ্দেশ্য টুকরো টুকরো জাতিকে গোলাম বানানো সহজ করা।”
বাংলাদেশের সরকার এই ধরনের হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও এখনো স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপের কথা জানানো হয়নি। পুলিশ ও প্রশাসন বলছে, ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে সময় লাগবে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় অনেকেই আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংখ্যা নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সরকারের মতবিরোধ কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।