ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর শেখ হাসিনার সমালোচনার প্রভাব নিয়ে মন্তব্য

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সমালোচনার জন্য ভারত সরকার দায়ী নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একমাত্র রাজনৈতিক দল বা সরকারের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশ জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় ভারত, জানায় মিশ্রি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর শেখ হাসিনার সমালোচনার প্রভাব নিয়ে মন্তব্য

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সমালোচনার জন্য ভারত সরকার দায়ী নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একমাত্র রাজনৈতিক দল বা সরকারের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশ জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় ভারত, জানায় মিশ্রি।

ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৪: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতি এবং বিরোধ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সম্প্রতি ভারতের সংসদের স্থায়ী কমিটির কাছে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

মিশ্রি জানিয়েছেন যে, ভারতের সরকার শেখ হাসিনার সমালোচনা বা বক্তব্যের প্রতি কোনো সমর্থন দেয় না। তিনি বলেন, “ভারত বাংলাদেশে কোনো একক রাজনৈতিক দলের বা সরকারের পক্ষে দাঁড়াবে না, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জনগণের স্বার্থে বজায় থাকবে।” মিশ্রি আরো বলেন, শেখ হাসিনা “ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম” ব্যবহার করে এসব মন্তব্য করছেন এবং ভারত সরকার তাকে কোনো প্ল্যাটফর্ম বা সুযোগ দেয়নি।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ভারতের অবস্থানও তিনি পরিষ্কার করেন। গত সোমবার ঢাকা সফরকালে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভারতের সম্পর্ক শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের সঙ্গে নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক।” তিনি এও বলেন যে, ভারত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের যে কোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে।

মিশ্রি আরও জানিয়েছেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনা ভারতের জন্য দুঃখজনক এবং এটি সম্পর্কের একটি উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, মিশ্রি বলেন, ভারত আশা করে যে, বাংলাদেশ তার দেশের স্বার্থেই এসব আক্রমণ বন্ধ করবে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্যে আরো বলেছেন যে, বাংলাদেশে ভারতীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভালো ফল দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তান ও চীন ছাড়া ভারত প্রায় সব প্রতিবেশী দেশেই গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশও অন্যতম। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ভারতের জন্য বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও সংযোগ সহযোগী, এবং দুই দেশের মধ্যে রেলপথ, বাস পরিষেবা, এবং অভ্যন্তরীণ জলপথের সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে, বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী রেল পরিষেবা বন্ধ রয়েছে।”

মিশ্রি ভারতের পক্ষ থেকে জানায়, ভারত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাগুলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে, তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকার সম্প্রতি ৮৮ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে, যারা সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং কিছু অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে।

মিশ্রি তার বক্তব্যে জানায়, ভারত সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশে বন্দী থাকা কিছু “সন্ত্রাসী” ব্যক্তিদের মুক্তি। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ভারত বিরোধী বক্তব্য দেয় এমন কিছু সন্ত্রাসীকে মুক্তি দিয়েছে, যা ভারতীয় পক্ষের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।”

এছাড়া, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশে ঘটমান পরিস্থিতি নিয়ে “ভুল তথ্য প্রচারের” অভিযোগ তোলা হয়েছে, যার ব্যাপারে মিশ্রি জানান যে, দুই দেশই তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মিশ্রি আরও জানায়, তার ঢাকা সফরের সময় তিনি বাংলাদেশের বিদেশনীতি উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব মোহাম্মদ জশিম উদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি এ সময় বলেন, “বাংলাদেশের জন্য আমাদের একটাই আশা, এটি একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ হয়ে উঠুক।”

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আরো উল্লেখ করেন, গত বছরে ভারত ১৬ লাখ ভিসা জারি করেছে, যা বাংলাদেশ থেকে আসা সবচেয়ে বড় সংখ্যক ভিসা। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশকে “যতটা সম্ভব ভালো প্রতিবেশী” হিসেবে দেখছে এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রেও উভয় দেশের মধ্যে কিছু দিক থেকে পারস্পরিক লাভজনক অবস্থান তৈরি হয়েছে।

মিশ্রি বলেন, তার ঢাকা সফর থেকে যে ফল পাওয়া গেছে, তাতে উভয় পক্ষই তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তবে তিনি জানান, তিনি প্রফেসর ইউনুসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর্যালোচনার বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, একদিকে যেমন সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করছে, অন্যদিকে তা দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

তারিখ: ১৪.১২.২০২৪