বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সংখ্যালঘুরা

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে অস্বীকার করা এবং ন্যায়বিচার না দেওয়ার। টিআইবি রিপোর্টে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জন নিহত এবং অন্যান্য নির্যাতন রয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সংখ্যালঘুরা

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে অস্বীকার করা এবং ন্যায়বিচার না দেওয়ার। টিআইবি রিপোর্টে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জন নিহত এবং অন্যান্য নির্যাতন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৪: যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা দাবি করেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখাচ্ছে এবং এতে সরকারের যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে, যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংগঠন নীলাচলের নেতা প্রাণেশ হালদার বলেন, “এই সহিংসতার মূল চরমপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীগুলো, যারা সরকারকে সমর্থন করেছে, তারা এসব ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করছে। একটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই অপরাধগুলোর প্রকাশ এবং চরমপন্থীদের চেহারা উন্মোচন হওয়া উচিত।”

প্রাণেশ হালদার আরও জানান, “বাংলাদেশে সকল সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়, ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করছে।” তিনি বলেন, “ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় বাস্তব পরিস্থিতি আরও গম্ভীর এবং গুরুতর। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা ২০% থেকে ৮%-এ নেমে এসেছে।”

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) রিপোর্টে জানানো হয়, ৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে ২১০০টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯ জন সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। এছাড়া, দুর্গাপূজা চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে, গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটির নেত্রী মৌসুমী মিত্র চৌধুরী বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের আত্মীয়রা বিভীষিকায় দিন কাটাচ্ছে। প্রতিদিন তারা ভয়ে আতঙ্কে থাকে এবং কেউ কিছু বলতে গেলেই তাদের এবং তাদের পরিবারের ওপর অমানবিক আচরণ করা হয়।”

মৌসুমী মিত্র চৌধুরী আরও জানান, “এখনকার মতো ভীতিকর পরিবেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আগে কখনও জীবনযাপন করেনি।” তার মতে, “বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘুদের রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, সরকার হত্যা, রাহাজানি, ঘরবাড়ি ও মন্দির পোড়ানো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, চাকরি হারানো সবকিছুই একেবারে অবজ্ঞা করছে।”

বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টের ৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে ২১০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতার মধ্যে ৯ জন নিহত, ৪ জন ধর্ষিত, ৬৯টি উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং ৯১৫টি বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা রয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৮টি শারীরিক নির্যাতন এবং ২১টি জমি/ব্যবসা দখলের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ৫ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের খবর প্রচারিত হচ্ছে, তবে এ বিষয়ে বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে তথ্যের ফারাক রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “যে কোনও সহিংসতা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে দোষীদের বিচার করা হবে এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এছাড়া, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ২২ অক্টোবরের পরের ঘটনাগুলোর আপডেট দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং ৮৮টি মামলা করা হয়েছে বলে জানান, যাতে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা যে যথেষ্ট নয়, এমন মন্তব্য এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র জানান, “আমরা বাংলাদেশের সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অব্যাহত পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই।” তবে, তিনি সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতার ঘটনার নিন্দা করেন।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন ২৬ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন, যেখানে তারা মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করেন।

এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বলেছেন, “সংখ্যালঘুদের মন্দির ও ধর্মীয় স্থানগুলোতে হামলার খবর পাওয়া গেছে।” তিনি বলেন, “এ ধরনের সহিংসতার পরিণতি সার্বিক নিরাপত্তার অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।”

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়েছে। কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ করা হয়েছে এবং ত্রিপুরাতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

এখন, এই সব ঘটনায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

তারিখ: ১৪.১২.২০২৪