সম্পত্তি বিক্রি করতে গেলে বাধা আসছে, জানাচ্ছেন বাংলাদেশি সংখ্যালঘুরা
Categories:

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের কারণে উদ্বেগ বাড়ছে। পেট্রাপোল সীমান্তে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা সংখ্যালঘুরা জানাচ্ছেন, পরিচিতদেরও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, জমি-বাড়ি বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত, দুষ্কৃতীরা হামলা ও নির্যাতন চালাচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ বৈঠক থেকে স্থায়ী সমাধান চাচ্ছেন তারা। (সূত্রঃ আনন্দবাজার)
পেট্রাপোল, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যে আশঙ্কা ও আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। এক প্রবীণ সংখ্যালঘু ব্যক্তি আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘পথেঘাটে দেখা হলে ইদানীং ওঁরা কেমন যেন এড়িয়ে চলছেন।’’ তিনি জানান, অনেক বছর ধরে পরিচিতরা, যারা কখনো বিপদে-আপদে পাশে ছিলেন, এখন দূরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। ‘‘খুবই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা,’’ বলছিলেন তিনি, তার কথায় স্পষ্ট ছিল যে, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে যে, পুরনো সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশ্বাসের জায়গা কমে যাচ্ছে।
এমন একটি সময়েই, সোমবার পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি। একই দিন, নড়াইল থেকে আসা এক বৃদ্ধ দম্পতি ছিলেন পেট্রাপোলে। তাদের কথায় আরও একটি হৃদয়বিদারক চিত্র ফুটে ওঠে। বৃদ্ধা বলেন, ‘‘পরিস্থিতি এমন হয়েছে, আমরা অনেক সংখ্যাগুরুর কাছে যা টাকা-পয়সা পেতাম, তা ফেরত চাইতে সাহসই পাচ্ছি না।’’ তিনি জানালেন, তাঁদের জমির গাছগাছালি কেটে বিক্রি করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং সেখানে ভয় দেখানো হচ্ছে। বৃদ্ধের স্বামী জানালেন, ‘‘সংখ্যালঘুদের জমি-বাড়ি বিক্রি করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের আশঙ্কা, অন্যত্র চলে গেলে সব দখল হয়ে যেতে পারে।’’ এই ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নড়াইলের আরও এক মহিলা জানালেন, ‘‘রাত নামলেই আতঙ্ক গ্রাস করছে। গরু-ছাগল লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। পথেঘাটে টাকা-পয়সা নিয়ে নির্ভয়ে বের হওয়া যাচ্ছে না। ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে।’’ এমন কঠিন অবস্থায়, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে ভারতে পেট্রাপোল সীমান্তে আশ্রয় খুঁজছেন এই মানুষগুলি।
এক আরেকটি ঘটনা তুলে ধরেন, বাংলাদেশ থেকে এসেছেন সন্তোষ বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, ‘‘দেশের পরিস্থিতি ভাল নয়। গ্রামে গ্রামে বনভোজন, জলসা করবে বলে জোর করে টাকা চাইছে কেউ কেউ। না দিলে নানা ভাবে নির্যাতন চলছে, হুমকি দিচ্ছে।’’ এ ধরনের হুমকি এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি সংখ্যালঘুদের জীবনে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের কেশবপুরের বাসিন্দা, প্রাক্তন আওয়ামী লিগের জনপ্রতিনিধি জানান, ৬ অগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার বাড়িতে হামলা হয়েছিল। ‘‘ভাঙচুর, লুঠপাট চালানো হয়। বাড়ির মহিলারা এখনও রাস্তায় বেরোতে পারছেন না,’’ তিনি বলেন। একটি আরেকটি ঘটনার কথা শোনান এক বাংলাদেশি মহিলা, যার বাড়িতে দুষ্কৃতীরা লুটপাট করতে এসেছিল, কিন্তু স্থানীয় সংখ্যাগুরুর সাহায্যে তাদের প্রতিহত করা হয়েছিল।
এছাড়া, পেট্রাপোল সীমান্তে উপস্থিত বাংলাদেশি নাগরিকরা দৃষ্টি রেখেছিলেন ঢাকায় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদেশ সচিব পর্যায়ের বৈঠকের দিকে। ‘‘আমরা সবাই চাইছিলাম, বৈঠক থেকে স্থায়ী সমাধান সূত্র বের হোক। যাতে আমরা আমাদের দেশে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।’’ তারা তাদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ‘‘আমরা চাই আমাদের দেশে শান্তিপূর্ণভাবে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে।’’
এদের মধ্যে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, তাদের দেশে দমন-পীড়ন ও অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে পারে, যদি দ্রুত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। তাদের প্রত্যাশা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মাধ্যমে তারা যেন নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারেন, সেই আশাতেই তারা অপেক্ষা করছেন।
পেট্রাপোল সীমান্তে বাংলাদেশের এই উদ্বাস্তুদের মধ্যে এক ধরনের নিঃশব্দ সংগ্রাম চলছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই নিজেদের সম্পত্তি ও বাড়ি-বাড়ির কষ্টার্জিত বস্তু হারিয়েছেন, আবার কেউ কেউ এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। অনেকেই জানাচ্ছেন, ‘‘বাড়ি ফিরলে আবার হামলা হতে পারে।’’
তারিখ: ১০.১২.২০২৪