ঢাকায় দাঁড়িয়ে দিল্লির বার্তায় সংখ্যালঘু-সুরক্ষাও
Categories:

ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী ঢাকায় বৈঠক শেষে বলেছেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আগের মতোই সুসম্পর্ক চায় ভারত। তিনি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা হয়েছে, যেমন বিদ্যুৎ, শক্তি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় সম্পত্তির নিরাপত্তা।
ঢাকা, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং দু’দেশের সম্পর্কের অস্থিরতার মধ্যেও ভারত তার প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। এই অবস্থানটি স্পষ্ট করেছেন ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী। সোমবার সকালে ঢাকায় পৌঁছানোর পর, তিনি বাংলাদেশের বিদেশসচিব মহম্মদ জসীম উদ্দিনের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। বৈঠকটি প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ধরে চলে। যদিও বৈঠক শেষে তৎক্ষণাৎ কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা জানা যায়নি, তবে মিস্রী সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে বৈঠকের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
মিস্রী জানান, “আমাদের মধ্যে অত্যন্ত খোলামেলা, গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং উভয়ের পক্ষে লাভজনক সম্পর্ক চায় ভারত।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ও অব্যাহত রাখার জন্য সুস্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ভারতের বিদেশসচিব আরও বলেন, “অতীতের মতোই বর্তমানেও নয়াদিল্লি ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ভারত কোনো ধরনের সম্পর্কের টানাপড়েনের পরেও তার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুষ্ঠু এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক রাখতে চাইছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আলোচনায় মিস্রী আরও উল্লেখ করেন যে, তাদের বৈঠকে বিদ্যুৎ, শক্তি, যোগাযোগ, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন, যার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ভারত।
তবে, মিস্রী উল্লেখ করেন যে, তিনি বৈঠকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে, এবং ভারত এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিস্রী বলেছেন, “আমরা সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও আলোচনা করেছি এবং আমি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং উন্নয়ন নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি।” ভারতের বিদেশসচিব আরও বলেন, “আলোচনায় এসেছিল সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সম্পত্তির উপরে হামলার ঘটনাও।”
এদিকে, মিস্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও কিছু মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে যে একাধিক পরিবর্তন ঘটেছে, তা তিনি উপলব্ধি করেছেন। তবে, তার মন্তব্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি ভারতের মনোভাব। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৪ সালে মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেওয়ার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে ছিলেন যিনি ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এটি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে স্বীকার করার এক ধরনের ইঙ্গিত।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত সম্পর্কের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে মিস্রী আরও বলেন, “ভারত এবং বাংলাদেশ দুটি প্রতিবেশী দেশ, যারা একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবসময়ই বিশ্বাস করি যে, আমাদের সম্পর্কের উন্নতি হবে এবং দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি আরও দৃঢ় হবে।”
এদিকে, মিস্রী ঢাকায় অবস্থানকালে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন, যার মধ্যে ছিল চট্টগ্রামের সিটি মেয়র, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং রাজনৈতিক নেতারা। এই বৈঠকগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে ছিল নিরাপত্তা, অর্থনীতি, এবং ধর্মীয় সম্পত্তি নিরাপত্তার বিষয়।
মিস্রী নিজে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যত সম্পর্কের ওপর তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী হতে চলেছে, এবং আমি আশা করি আগামী দিনে এর আরও উন্নতি হবে।”
এছাড়া, মিস্রী বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা সমাধান চাই, আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় রয়েছে যা আমরা একযোগে সমাধান করতে পারব। আমরা আশা করি যে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই পরস্পরকে সহযোগিতা করবে এবং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”
বাংলাদেশে ভারতীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গেও মিস্রী বলেছেন, “ভারতীয় সরকার সবসময় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”
দু’দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ এবং শক্তি বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ভারত বিভিন্ন সময়ে সহায়তার কথা জানিয়েছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। মিস্রী জানিয়েছেন, ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করবে।
এছাড়া, মিস্রী সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ারও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পেলে দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, পর্যটন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতি ভারত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে।”
বৈঠকের শেষে, মিস্রী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতি ও উভয়ের পক্ষের লাভজনক সহযোগিতার প্রতি ভারতের অটুট মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, “বাংলাদেশ ও ভারত দুটো প্রতিবেশী দেশ, এবং আমাদের মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তারিখ: ১৫.১২.২০২৪