উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কও ভর করছে ওঁদের উপরে

পেট্রাপোল সীমান্তে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে যাতায়াত করছেন। বৃদ্ধ আনন্দ বালা ও অন্যরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বাড়ছে। তারা উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় ভারতে আশ্রয়ের দাবি করেছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগীরা। (সূত্রঃ আনন্দবাজার)
উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্কও ভর করছে ওঁদের উপরে

পেট্রাপোল সীমান্তে বাংলাদেশি সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে যাতায়াত করছেন। বৃদ্ধ আনন্দ বালা ও অন্যরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বাড়ছে। তারা উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কায় ভারতে আশ্রয়ের দাবি করেছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগীরা। (সূত্রঃ আনন্দবাজার)

পেট্রাপোল, ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৪: পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাতায়াত করা সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমলেও তাদের উদ্বেগ থামেনি। বিশেষ করে, বৃদ্ধ আনন্দ বালার মতো অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে সীমান্ত পার করছেন। আনন্দ বালা, যিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছিলেন, জানালেন যে, দেশের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হবে, তা ভাবতেই পারছেন না। তিনি বললেন, “চোখের সামনে যে দেশটা স্বাধীন হতে দেখলাম, সেই দেশের এমন ভয়াবহ পরিণতি হবে, ভাবতেই পারছি না।” বয়সের কারণে এখন কোনো কাজ করতে পারছেন না তিনি, কিন্তু তার উদ্বেগ এবং চিন্তা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত গভীর।

আনন্দ বালার মতে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি আচমকা খারাপ হয়নি। এটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ঘটছে। তিনি জানান, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার এখন অনেক বেড়েছে এবং তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বসবাসের পরিস্থিতি নেই। জন্মভিটে ছেড়ে জমি-বাড়ি বিক্রি করে এ দেশে চলে আসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। পুলিশ প্রশাসন কিছুই করছে না।”

একইভাবে, গোপালগঞ্জের এক বৃদ্ধ জানান, বয়সের কারণে জন্মভিটে ছেড়ে আসা তাদের কাছে অত্যন্ত কষ্টকর। তবে, তিনি জানান, দেশে তাদের অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছে, আর এই কারণে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তার মতে, “নিরুপায় হয়ে আসতে হচ্ছে, আর বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের পর আমাদের উপর অত্যাচার আরও বাড়বে। আমরা চাই, ভারত আমাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে আশ্রয় দিক।”

মণিরামপুরের আরেক বৃদ্ধের মতে, “সামনে বাংলাদেশে নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন হয়ে গেলে আমাদের উপর অত্যাচার আরও বাড়বে। আমরা চাই, ভারত আমাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে আশ্রয় দিক।” এটি খুবই দুঃখজনক যে, দেশে এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বহু মানুষ তাদের বসবাসের জায়গা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে, যশোর থেকে আসা সরোজকুমার ঘোষ জানান, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমে যেটুকু দেখানো হচ্ছে, তা বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি। তিনি জানান, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে এতটাই আতঙ্ক যে, পেট্রাপোল সীমান্তে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতেও তারা ভয় পাচ্ছেন। এই আতঙ্কের কারণ হলো, যদি তারা দেশে ফিরেন, তাহলে অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাদের ভাষ্য, “আমরা জানি না আর কখনও এ দেশে আসতে পারব কি না! তবে, ভারত সরকারের কাছে আমাদের আর্জি, আমাদের বাঁচাতে পদক্ষেপ করুন।”

এছাড়া, সলমান হোসেন নামে এক ব্যক্তি যারা এই দেশে চিকিৎসা শেষে ফিরছিলেন, তিনি আরও একটি সমস্যা তুলে ধরেন। তিনি জানান, “আনাজ-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম গরিব মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। সরকারি মদতে ভারত সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা চাই দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকুক।” সলমানের মতে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ তা দুই দেশের জনগণের জন্যই উপকারী হবে।

যদিও বাংলাদেশে আসা বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের বেশিরভাগেরই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে যাচ্ছেন, তবুও তাদের মধ্যে উদ্বেগের শেষ নেই। এক যুবক জানালেন, “জানি না আর কখনও এ দেশে আসতে পারব কি না!” তার মুখে হতাশা স্পষ্ট ছিল, এবং তিনি ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে বললেন, “আমাদের বাঁচানোর জন্য পদক্ষেপ করুন।”

এই পরিস্থিতিতে, পেট্রাপোল সীমান্তে আসা বাংলাদেশি সংখ্যালঘুরা একটি সাধারণ জীবনযাপনের জন্য উদ্বেগে আছেন। তারা জানেন না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে এবং তারা আশা করছেন, ভারত সরকার তাদের পরিস্থিতি বুঝে কোনও পদক্ষেপ নেবে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, তাদের অস্তিত্ব সঙ্কট, এবং সেই কারণে ভারতে আসা সংখ্যালঘুদের আত্মবিশ্বাসের অভাব এসময় দেশটির রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, আর এর ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে, এই আশঙ্কা করছেন তারা। তারা জানেন, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিষয়টি এখন আর গোপন নয়, এবং এটি সামাজিক স্তরে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া, ভারতের সাথে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে, কিছু ব্যক্তির মত, ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলে, দুই দেশের নাগরিকরা আরও নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের জন্য ভারতের সাহায্য এবং আশ্রয়ের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে।

পেট্রাপোল সীমান্তের সংখ্যালঘু বাংলাদেশিদের অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন। তারা কোনও নির্দিষ্ট আশ্রয় বা নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছেন না, এবং আশঙ্কা করছেন যে, তারা হয়তো আর কখনও এই দেশে ফিরে আসতে পারবেন না।

তারিখ: ১০.১২.২০২৪