চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ; ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন একাধিক বাংলাদেশি
Categories:

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ইস্কন সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর। মৌলবাদী গোষ্ঠী ইস্কনকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে। প্রাণ বাঁচাতে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি হিন্দু ভারতে পালিয়ে এসেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা শোনালেন তারা। (সূত্রঃ এবিপি লাইভ)
কলকাতা, ৩০ নভেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশের পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত সঙ্কটজনক হয়ে উঠেছে। হিন্দুদের ওপর মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির আক্রমণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ইস্কন (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণচৈতন্য আন্দোলন) এর সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর থেকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের ধর্মীয় স্থান ও বাড়িঘর আক্রান্ত হচ্ছে, এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও মৌলবাদীদের হুমকি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে অনেকেই বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে এসেছেন, তাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।
ঢাকার সাভার থেকে আসা মঞ্জু মণ্ডল, যিনি ইস্কন-এর ভক্ত, জানালেন যে তিনি এখনো ভয়ঙ্কর স্মৃতির মধ্যে আছেন। চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং এর পর থেকেই বাংলাদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির আক্রমণ আরো বেড়ে গেছে। মঞ্জু বলেন, “ওঁকে (চিন্ময়কৃষ্ণ দাস) কেন সনাতন ধর্ম নিয়ে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছিল না? তিন মাস ধরে তাঁরা সনাতন ধর্মের স্বীকৃতি চাইছিলেন। কিন্তু উনি সঠিক কাজ করছিলেন। আমাদের প্রভু কষ্ট পাচ্ছেন, আমরা তার কষ্ট অনুভব করছি।”
এদিকে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর বাংলাদেশে অস্থিরতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে, বিভূতিভূষণ মণ্ডল, একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ কর্মী, ভারতে পালিয়ে আসেন। তিনি জানান, “আমরা সংখ্যালঘু, আমাদের নিরাপত্তা নেই। ৫ আগস্ট আমার বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। হিন্দুদের জন্য এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না।”
ফরিদপুরের ব্যবসায়ী তুষার দত্ত, যিনি এখন কলকাতায় বসবাস করছেন, তার পরিবার এখনও বাংলাদেশে রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, “আমার বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়রা এখন ব্যবসা করতে পারছেন না, বাড়িঘর ভাঙচুর হচ্ছে, এবং তারা এখন কোনোভাবেই ভারতে আসার সাহস পাচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় মৌলবাদীরা ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা দাবি করছে, না হলে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।”
বাংলাদেশে হিন্দুদের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। একদিকে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির সহিংস আক্রমণ, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অক্ষমতা, এসব কারণে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এর ফলে অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের কথায়, “আমরা এখন আর বাংলাদেশে নিরাপদ বোধ করি না। আমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে ভয় ও আতঙ্ক আমাদের কাছে একটা দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক উত্তেজনার মধ্যে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মৌলবাদী গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে তাদের দাবিগুলো আদায় করার চেষ্টা করছে, এবং তাদের জন্য বাংলাদেশে হিন্দুদের জীবন এক প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারকে বাধ্য করা হচ্ছে। বাংলাদেশে মৌলবাদী হামলাগুলির প্রেক্ষিতে, ভারত সরকারেরও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা হিন্দুদের জন্য আশ্রয় এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশে হিন্দুদের এই দুঃসময়ে সমগ্র বিশ্ব দেখছে, এবং এই সংকটের একটি সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক হয়ে কাজ করতে পারে এমন আশার সঞ্চার হচ্ছে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, কবে সেখানকার হিন্দুরা তাদের বাঁচার অধিকার ফিরে পাবে এবং কবে তাদের বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তারিখ: ০১.১২.২০২৪