সংখ্যালঘু ইস্যু সরকার কতটা সামাল দিতে পারছে
Categories:

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় দেশে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি, বিক্ষোভ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা দেখা গেছে। পরিস্থিতি শীর্ষে পৌঁছেছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে। (সূত্রঃ বিবিসি)
ঢাকা, ৩০ নভেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সনাতন জাগরণের মঞ্চের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় দেশেই পাল্টাপাল্টি বিবৃতি, বিক্ষোভ এবং সামাজিক মাধ্যমে পতাকা অবমাননা, ধর্মীয় স্থানে হামলা এবং নানা ধরনের প্রচারণা চলছে। এর ফলস্বরূপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিস্থিতি সংকটময় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং তাদের উপাসনালয় ভাংচুরের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিশেষত দুর্গাপূজার সময় কিছু ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে, তবে অনেকের মতে সরকারের ভূমিকা পর্যাপ্ত ছিল না। বিশেষ করে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে বৈষম্যের শঙ্কা এবং কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব প্রতীয়মান হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছেন যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের মন্দির এবং ধর্মীয় স্থানগুলোর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ভারত এই ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জাতিসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক ফোরামে জানিয়েছে যে, মিথ্যা তথ্য প্রচার হচ্ছে এবং দেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত হামলা হয়নি। তবে ভারতের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিক মাধ্যমে ভারতের দ্বিচারিতার সমালোচনা করেছেন।
তবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ব্যাপারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। বিশেষ করে বেশ কিছু ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী দাবি করেছেন যে, সরকারের দায়িত্বহীনতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নেতৃত্বে সনাতন জাগরণ মঞ্চ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশের আয়োজন করে। তার বক্তব্যে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং তাদের অধিকার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই সমাবেশ থেকে আটটি দাবি উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে সংখ্যালঘুদের জন্য একটি বিশেষ নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি ছিল। তবে এই সমাবেশের পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং তার সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। চট্টগ্রাম ও রংপুরে তার সমাবেশের ছবি এবং বক্তব্য প্রচারিত হওয়ায়, সেখানকার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে, চট্টগ্রাম শহরে এক আইনজীবী নিহত হন, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভারতের তরফ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকলেও, একজন ধর্মীয় নেতা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন কথা বলেছেন, তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।” এর প্রতিক্রিয়ায়, বাংলাদেশ সরকার একটি বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর কিছু মহল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে যা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে খারাপ করতে পারে।
এরপর, কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশি পতাকা ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। বাংলাদেশ সরকার এর তীব্র নিন্দা জানায়। তবে ভারতীয় মন্ত্রী রণধীর জয়সওয়াল এক সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, “বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সব সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে।”
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর প্রভাব পড়েছে। উভয় দেশের সরকারই একে অপরকে অভিযুক্ত করছে এবং সামাজিক মাধ্যমে উস্কানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত হামলার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মাঝে বাংলাদেশের সরকারের পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এসব ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। তারা সরকারের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতার প্রতি আস্থা রাখতে ইচ্ছুক।
এই সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যত নির্ভর করছে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সংযমের উপর। তবে, এটি স্পষ্ট যে, সরকারকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা যায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে।
তারিখ: ০১.১২.২০২৪