মন্দিরে 'হামলা', এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছেন হিন্দুরা, নীরব দর্শক প্রশাসন
Categories:

বাংলাদেশে হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি ঘিরে উত্তেজনা। চট্টগ্রামে দুটি মন্দিরে হামলার অভিযোগ উঠেছে, সঙ্গে হামলা চালানো হয়েছে দোকানেও। বাংলাদেশ পুলিশ ও সেনা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, এবং ভারত সরকারের সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ। (সূত্রঃ আজতক)
ঢাকা, ২৯ নভেম্বর, ২০২৪: বাংলাদেশে হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। তার গ্রেফতারির প্রতিবাদে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, যখন জানা গেছে, চট্টগ্রামে দুটি মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার শিকার মন্দির দুটি হল রাধা গোবিন্দ মন্দির এবং সনাতনেশ্বরী মাতৃ মন্দির। হামলার অভিযোগ বিএনপি দলের সদস্যদের এবং একটি স্থানীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে। হামলার সময় পুলিশ ও সেনার ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের মতো, এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলার পর এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয় দোকানগুলিতে হামলা চালানো হয় এবং ক্ষতি করা হয়, কিন্তু পুলিশ বা সেনা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এই ঘটনা আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহিংসতার চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই উত্তেজনার মূল কারণ, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি, যাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারের পর, তার সমর্থকরা তাকে মুক্তির জন্য এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন। তার গ্রেফতারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও সরব হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক বাংলাদেশের প্রশাসনের কাছে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার দাবি জানায়। তাদের মতে, হিন্দুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, ইসকন (আন্তর্জাতিক সৎসঙ্গ-কৃষ্ণ-কেন্দ্র) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারির প্রতিবাদে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি জানায় এবং এর সঙ্গে ধর্মীয় সুরক্ষার কথা উল্লেখ করে। ইসকন কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পর সরকারের উচিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারির পর, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে যে, তার জামিনের আবেদন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে খারিজ করা হয়েছে এবং পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদনও করা হয়নি। আদালত তাকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়। এই আইনি পদক্ষেপে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, কারণ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা বাংলাদেশে হিন্দুদের প্রতি সহিংসতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে গত কয়েক বছরে এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে এবং এর পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাসিনা সরকারের শাসনকালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি উঠছে। সরকার এই অভিযোগগুলি নাকচ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও এই বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে সুনিশ্চিত সংখ্যালঘু সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, তাদের দেশ এই ঘটনার সঠিক তদন্ত চায় এবং হিন্দুদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তাদের ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষিত থাকতে হবে।
এদিকে, বাংলাদেশে এসব ঘটনার পর কলকাতাতেও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যেখানে চট্টগ্রামে হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারির প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এসব প্রতিবাদ শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, বরং ওপার বাংলাতেও সশক্ত হয়ে উঠছে। বিশেষত, বাংলাদেশ সরকার যখন তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
হামলার অভিযোগে পুলিশ এবং সেনার নীরব ভূমিকা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে বিশেষ করে মন্দির ও দোকানগুলির ওপর হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার কিছু পদক্ষেপ নেবে, এমন আশা পাওয়া যাচ্ছে। যদিও ইসকন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের তৎপরতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের সহিংসতা যদি অব্যাহত থাকে, তা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে।
তারিখ: ৩০.১১.২০২৪